জ্ঞান সারমর্ম

ভাটার ভিতরে তাপমাত্রা কীভাবে মাপা হয়?

ভাটার কোনও এলাকা থেকে তাপ বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে কী না তা দেখার জন্য সময়ে সময়ে বিভিন্ন এলাকার তাপমাত্রা পরিমাপ করা জরুরি। বাতাসবাহী নলে উত্তপ্ত গ্যাসের তাপমাত্রা যেমন দেখা জরুরি, তেমনই চিমনি, ভাটার বাইরের দেওয়াল এবং তৈরি হওয়া ইটের তাপমাত্রাও মাপা জরুরি। কোনও জায়গা দিয়ে তাপ বেরিয়ে গেলে একদিকে যেমন জ্বালানির অপচয় হয়, তেমনই ইটের গুণগতমানও হ্রাস পায়। ভাটার কোনও অংশ দিয়ে তাপ বেরিয়ে না গেলে ইটের মান ভালো হয়, ফলে বাজারে ইটের দাম থাকে চড়া। পাশাপাশি ফায়ারিং অঞ্চল কিংবা দহন এলাকার তাপমাত্রাও সময়ে সময়ে মাপতে হয়, কারণ সেখানেই ইট তৈরি হয়।

0

Advertisement

ভাটায় কোন যন্ত্র দিয়ে তাপমাত্রা মাপা হয়?

দুই ধরনের থার্মোমিটার দিয়ে ভাটার তাপমাত্রা মাপা হয়:

  1. ভাটার ভিতরের গ্যাসের সংস্পর্শে থাকা থার্মোমিটার
  2. ভাটার ভিতরের গ্যাসের সংস্পর্শে না থাকা থার্মোমিটার।

1. ভাটার সংস্পর্শে থাকা থার্মোমিটার

এই থার্মোমিটার দিয়ে ভাটার বিভিন্ন অংশে তাপের উৎসস্থলের গ্যাসের তাপমাত্রা মাপা হয়। সাধারণত এটি থার্মোকাপল (দুটি ভিন্ন ধাতুর তার দিয়ে তৈরি দুটি পাত যা এক জায়গায় গিয়ে মিলে যায়) ধরনের যন্ত্র। এর সূচক থাকে ভাটার বাইরে। যার ফলে বাইরে থেকেই থার্মোমিটারে তাপমাত্রা কত উঠল তা জানা যায়। এই ধরনের তাপমাত্রা খুবই সস্তা, সহজলভ্য এবং ব্যবহার করাও খুব সহজ।

2. ভাটার গ্যাসের সংস্পর্শে না থাকা থার্মোমিটার

চিমনির বাইরে কিংবা ভাটার দেওয়ালের তাপমাত্রা সাধারনত এই থার্মোমিটারের সাহায্যে পরিমাপ করা হয়। উত্তপ্ত দেওয়াল থেকে যে তাপ বিকীর্ণ হয় তা ইনফ্রারেড ডিটেক্টরের সাহায্য পরিমাপ করা হয়। এই থার্মোমিটার হাতে ধরে রাখতে সুবিধাজনক এবং হালকা। ভাটার যে সব এলাকায় থার্মোকাপল পৌঁছতে পারে না, সেখানকার তাপমাত্রা নিতে হয় এই ইনফ্রারেড প্রযুক্তির থার্মোমিটার দিয়ে।

Advertisement

থার্মোকাপল দিয়ে কীভাবে তাপমাত্রা পরিমাপ করতে হয়?

যে অংশের তাপমাত্রা পরিমাপ করতে হয় থার্মোকাপলের দুটি হাতকে সরাসরি তার সংস্পর্শে আনতে হয়। যে অংশের তাপমাত্রা মাপা হবে থার্মোকাপলের দুটি হাত যদি তার সরাসরি সংস্পর্শে না আসে তা হলে যথাযথ তাপমাত্রা পরিমাপ করা যায় না। গ্যাস কিংবা বাতাসের তাপমাত্রা মাপতে হলে থার্মোকাপলের দুটি হাতকেই সরাসরি তার সংস্পর্শে আনতে হবে। তপ্ত গ্যাস এবং বাতাস যখন দুটি হাতের উপর দিয়েই সমানভাবে বইবে তখন সূচকের কাঁটা স্থির হয়ে থাকবে।

ইনফ্রারেড প্রযুক্তির থার্মোমিটার দিয়ে কীভাবে তাপমাত্রা মাপা হয়?

যে অংশের তাপমাত্রা মাপা হবে তার ব্যপ্তি এবং সেই অংশ থেকে থার্মোমিটারের দূরত্বের উপরে নির্ভর করে ওই পরিমাপ কতটা সঠিক। যদি যে অংশের তাপমাত্রা পরিমাপ করা হবে তার এলাকা বড় হয় তবে থার্মোমিটার রাখতে হবে দূরে। যদি তপ্ত এলাকার এলাকা ছোট হয়, তবে কাছ থেকে তাপমাত্রা পরিমাপ করা হয়। তাই পরিমাপ কতটা সঠিক তা নির্ভর করে তপ্ত এলাকা (S) এবং থার্মোমিটারের দূরত্ব (D)- এই অনুপাতের উপরে।

যদি ছয় ইঞ্চি ব্যাসের জ্বালানি পথের ঢাকনার তাপমাত্রা পরিমাপ করতে হয়, তবে থার্মোমিটার D/S অনুপাত অনুসারে নির্দিষ্ট দূরত্বে রাখতে হবে। এখানে অনুপাত হবে 50:1 (ছবি দেখুন)। অর্থাৎ ওই জ্বালানি ঢোকানোর পথ থেকে থার্মোমিটারের দূরত্ব 50 x 6 = 300 ইঞ্চির মধ্যে থাকতে হবে। এর থেকে দূরে থার্মোমিটার রাখলে পরিমাপ সঠিক হবে না।

নীচের টেবিলে ভাটার বিভিন্ন অংশ থেকে (50:1) অনুপাতে থার্মোমিটারের দূরত্ব কত হবে তা দেখানো হয়েছে-

ভাটার অংশ সর্বাধিকদূরত্ব (ইঞ্চি)
জ্বালানী পথের ঢাকনা 300
প্রতিটি ইট 500

ফায়ারিংজোন বা দহন এলাকায় ইটের তাপমাত্রা কীভাবে মাপা হয়?

দহন অঞ্চলে প্রতিটি ইটে কতটা তাপ পৌঁছচ্ছে তা জানাটা খুবই জরুরি। তাতেই বোঝা যাবে ইট ঠিক মতো পুড়ছে কী না। তাপমাত্রার হেরফের দেখেই জ্বালানী কতটা পোড়াতে হবে, কখন পোড়াতে তা ঠিক করা হয়ে থাকে। দহন এলাকায় ইটের তাপমাত্রা পরিমাপ করতে Type K থার্মোকাপল ব্যবহার করা হয়। এই থার্মোমিটার 1400 ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা পরিমাপ করতে পারে। ভাটার দহন এলাকায় ওই তাপমাত্রায় সব থেকে ভাল ইট তৈরি হয়।

থার্মোকাপলের হাত দুটি জ্বালানী পথের ঢাকনা খুলে ভাটার দহন এলাকার মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এমনভাবে ওই দুটি হাতকে রাখা হয় যেন তারা ইটের গায়ে ঠেকে থাকে। বাইরে থাকা সূচকের মাধ্যমেইটের তাপমাত্রা রেকর্ড করা যাবে।

ইটের তাপমাত্রা মাপার ক্ষেত্রে যে যে বিষয় গুলির উপরে নজর রাখা প্রয়োজন-

  1. যে ছয়টি সারিতে ইট সাজানো থাকে, তার একেবারে মাঝের সারির ইটের তাপমাত্রা নেওয়া হয়। ছটি প্রকোষ্ঠেই এই পদ্ধতিতে ইটের তাপমাত্রা মাপা হয়।
  2. প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইটের সারির উপরের দিকের ইট, মাঝের দিকের ইট এবং শেষের দিকের ইটের তাপমাত্রা একই সঙ্গে নেওয়া হয়।
  3. ষষ্ঠ প্রকোষ্ঠে তাপমাত্রা যখন 500-650 ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছয় তখন জ্বালানী হিসেবে কয়লা দেওয়া শুরু হয়। প্রকোষ্ঠের তাপমাত্রা এর থেকে কম হলে জ্বালানী হিসেবে কাঠের গুড়ো বা অন্য উদ্ভিদ জাত জ্বালানি প্রবেশ করানো হয়।
  4. দ্বিতীয়,তৃতীয়এবং চতুর্থ প্রকোষ্ঠের তাপমাত্রা সব থেকে বেশি থাকে। তা 950-1050 ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। ভালো মানের ইট পেতে হলে ঘন ঘন ওই প্রকোষ্ঠ গুলির তাপমাত্রা মাপতে হয়।
  5. দিনের দুটি সময় নির্দিষ্ট করে প্রকোষ্ঠের তাপমাত্রা দেখা হয়। যেমন সকাল সাতটায় এক বার। সন্ধ্যা সাতটায় আরেক বার।

নালীপথে থাকা গ্যাসের তাপমাত্রা মাপা হয় কীভাবে?

মিয়ানার মেঝেতে থাকা নালীপথের মুখে থার্মোমিটার বসিয়ে নালীপথে থাকা গ্যাসের তাপমাত্রা মাপা হয়। পাশের নালীপথ থেকে কেন্দ্রীয় নালীপথে প্রবেশ করা গ্যাসের তাপমাত্রা নেওয়া হয়। ভাটার মেঝেতে কতটা নিম্নচাপ এলাকা তৈরি হবে তা ওই গ্যাসের তাপমাত্রা এবং চিমনির উচ্চতার উপরেই নির্ভর করে।

নালীপথে গ্যাসের তাপমাত্রা 80 থেকে 150 ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেই তা ভাটার মেঝেতে যে নিম্নচাপ এলাকা তৈরি করে সেটাই যথেষ্ট। তাপমাত্রা 150 ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে অতিরিক্ত তাপ নষ্ট হয়। সাধারণ থার্মোমিটার অথবা থার্মোকাপলের সাহায্যে এই তাপমাত্রা মাপা হয়।

ভাটার পৃষ্ঠদেশের তাপমাত্রা মাপা হয় কীভাবে?

ইনফ্রারেড থার্মোমিটার দিয়ে ভাটার পৃষ্ঠদেশের তাপমাত্রা মাপা হয়। থার্মোমিটারের সূচক যতো পরিষ্কার থাকবে এবং থার্মোমিটার যতো ঠান্ডা জায়গায় রাখা থাকবে, ভুলের আশঙ্কা ততো কমবে।

আরও জ্ঞান সারমর্ম জন্য এখানে ক্লিক করুন এখানে ক্লিক করুন ভাটার ভিতরে তাপমাত্রা কীভাবে মাপা হয়? মেইন পেজে যাওয়ার জন্যClick here to go to User Home