জ্ঞান সারমর্ম

বেশী উচ্চতার চিমনিযুক্ত আঁকাবাঁকা পথের ইটভাটা (Natural Draught Zigzag Kiln, NDZK)

১৯৯০ সাল থেকে ভারতে ইটভাটাগুলিতে নতুন এই প্রযুক্তি প্রচলন শুরু হয়। এই প্রযুক্তিতে যেহেতু উঁচু চিমনি বাতাস টেনে আগুনকে চিমনির ভিতরে আঁকাবাঁকা পথে ভাটার মধ্যে ঘোরাফেরা করায়, তাই একে প্রাকৃতিক ড্রাফট জিগজ্যাগ ভাটা বা NDZK বলে। এই ভাটার পরিকল্পনা,ফ্যান চালিত IDZK (আই.ডি.জেড.কে.) ভাটার থেকে নেওয়া যার চিমনির উচ্চতা কম।

আমাদের এখানে যে চিরাচরিত ইটভাটাগুলি আছে সেখানে চিমনি থাকে অনেক কম উচ্চতার। আর বাতাস ভাটার ভিতরের সুড়ঙ্গ বা খাঁড়ি দিয়ে একেবারে সোজা পথে যায়। অনেক সময় ভাটার ভিতরে জোরে বাতাস চালিত করার জন্য ফ্যান ব্যবহার করা হয়। এই দুটিক্ষেত্রেই ভাটার ভিতরে সোজা পথে বাতাস ঢোকানোর ফলে যে সব ইট বায়ুপথের উল্টো দিকে থাকে, সেগুলি ঠিক মতো পোড়ে না। এক দিকে ডিজেল ব্যবহার করার ফলে যেমন বায়ু দূষণ হয়, তেমনই সব ইট একসঙ্গে এক ভাবে পোড়ে না।

কিন্তু উঁচু চিমনির আঁকাবাঁকা পথের ইটভাটা (NDZK)-র ক্ষেত্রে ভাটা চালু করার সময়ে চিমনির নীচে আগুন জ্বালানো হয়। গরম বাতাস চিমনি দিয়ে বেরোতে শুরু করে। নীচে নিম্নচাপ এলাকা তৈরি হয়। আর তখনই নীচের নির্গমন পথ দিয়ে বাইরের ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকে পড়ে ভাটার ভিতরে। সেটা আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে ঘুরপাক খেতে থাকে। এবার ভাটার বিভিন্ন চেম্বারে রাখা কয়লায় আগুন দিলে আগুন বাতাসের পথ ধরে আঁকাবাঁকা পথে ঘুরে বেড়ায় চিমনির ভিতরে। সব ইট একই সঙ্গে সমান তাপ পায়। ফলে কোনও ইট আধপোড়া অবস্থায় থাকে না।

0

Advertisement

এই ভাটা কী ভাবে কাজ করে?

চিমনি দিয়ে গরম হাওয়া বাইরে বেরিয়ে যায়। এর ফলে ভাটার অভ্যন্তরে নিম্নচাপ এলাকার তৈরি হয়। যা বাইরের ঠাণ্ডা হাওয়াকে ভাটার মধ্যে চালনা করে। ভাটার ঠিক মাঝখানে যে আয়তক্ষেত্রকার এলাকা থাকে সেটাকে বলে মিয়ানা। মিয়ানার ঠিক কেন্দ্রস্থল বরাবর থাকে চিমনি। মিয়ানা আর ভাটার বাইরের দেওয়ালের মধ্যবর্তী এলাকায় সুরঙ্গ কাটা থাকে। সেই সুরঙ্গ বা খাঁড়িতে কাঁচা ইট পোড়ানোর জন্য থাক করে সাজানো হয়। বাইরের দেওয়ালে পর পর বেশ কয়েকটি ফুটো বা নির্গমন পথ থাকে। যাদের বলা হয় জানালা। ওই জানালা দিয়ে যেমন তৈরি হওয়া ইট ভাটার বাইরে বের হয়, তেমনই বাইরে থেকে ঠাণ্ডা হাওয়া ঢুকে পড়ে ভাটার ভিতরে। চিমনি যতো বেশি করে গরম বাতাস বাইরে বেরোবে, ভাটার ভিতরে নিম্নচাপের শক্তি ততো বাড়বে আর জানালা দিয়ে হু হু করে ঢুকবে বাইরের বাতাস। পরে এক একটা চেম্বার বা কুঠুরিতে অগ্নি সংযোগ করা হবে, তখন আগুন বাতাসের পিছনে পিছনে আঁকাবাঁকা পথে কুঠুরির ভিতরে ঘুরে বেড়াবে। একটা কুঠুরিতে ইট তৈরি হয়ে গেলে পরের কুঠুরিতে আগুন জ্বালানো হবে। প্রথম কুঠুরির ইট বের করে সেখানে কাঁচা ইট সাজানো হবে।

এই ধরনের ভাটায় দিনে 20,000 থেকে 50,000 ইট তৈরি হয়। একবার আগুন জ্বালালে পুরো এক মরসুম (এক বর্ষার শেষ অর্থাৎ নভেম্বর থেকে পরের বর্ষার শুরু অর্থাৎ জুন পর্যন্ত) তা জ্বলতে থাকে। আগুনকে শুধু এক প্রকোষ্ঠ থেকে অন্য প্রকোষ্ঠে চালনা করতে হয়, আর লাগাতার কয়লা বা অন্য জ্বালানির যোগান দিয়ে যেতে হয়।

বাতাস চলাচলের পথ (মাঝখানে)
বাতাস চলাচলের পথ (দুই ধরে)

খাঁড়ি বা সুরঙ্গে বাতাস ঢোকা ও বেরোনোর জন্য তিনটি পথ রয়েছে। যেখানে ইটের থাক শুরু হচ্ছে সেখানে, যেখানে ইটের থাক শেষ হচ্ছে সেখানে আর ইটের থাকের মাঝের অংশে। খাঁড়ি বা সুরঙ্গ কতটা চওড়া তার উপরে পাশাপাশি কটা থাকে ইট সাজানো যাবে তা পুরোপুরি নির্ভর করে। সাবেকি ইটভাটাগুলিতে পাশাপাশি থাকা প্রতিটি থাকেই ইটের সংখ্যা একই। কিন্তু এই নতুন প্রযুক্তির ভাটায় মিয়ানা আর বাইরের দেওয়ালের ইটের থাকের উচ্চতা কম। যতো থাক মাঝখানের দিকে এগোতে থাকে থাকের উচ্চতাও বাড়তে থাকে। এই ব্যবস্থায় প্রতিটি থাকে প্রতিটি ইটে সমান পরিমান তাপ পৌঁছানোর সম্ভাবনা বাড়ে। নালী পথে যাতে বেশি হাওয়া সুরঙ্গে পৌঁছয় সেটাও দেখা হয়।

এই ধরনের ভাটায় প্রতিটি প্রকোষ্ঠ বা চেম্বারে ইটের ধাপগুলি এমন ভাবে সাজানো হয়, যাতে দুটি ধাপের মাঝখানের ফাঁকা অংশ দিয়ে বাতাস আঁকাবাঁকা পথ ধরতে বাধ্য হয়। সাধারণত প্রতিটি প্রকোষ্ঠে পঞ্চম ধাপ পেরিয়ে বাতাস উন্মুক্ত হয় এবং পরের প্রকোষ্ঠের দিকে যায়।

এ ধরনের ভাটার কিন্তু কোনও ছাদ থাকে না। কাঁচা ইটের থাকের উপরে নয় থেকে ১২ ইঞ্চি পুরু করে ইটের মিহি গুঁড়ো বিছানো থাকে। বাইরের প্রতিকূল অবস্থা যেমন ওই পুরু আস্তরণ প্রতিহত করে, তেমনই ইটের থাক থেকে তাপ যাতে বাইরে বেরোতে না পারে, তার দিকেও নজর রাখে। ইটের ধুলোর পুরো আস্তরণটাই আসলে ভাটার ছাদের কাজ করে।

Advertisement

নতুন প্রযুক্তির মূল কার্যকর অংশগুলি কী কী (three distinct zones)?

NDZK প্রযুক্তির মূল অংশ তিনটি।

  1. ইট পোড়ানোর অঞ্চল বা ফায়ারিং জোন যেখানে কয়লা অন্য জ্বালানির সাহায্যে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ইট তখন পুড়তে থাকে। ওই অঞ্চলটাই ভাটার রান্নাঘর।
  2. কাঁচা ইট রাখার অঞ্চল অর্থাৎত প্রি হিটিং জোন যেখানে সরাসরি আগুনের সংস্পর্শে আনার আগে কাঁচা ইটগুলিকে প্রি হিটিং জোনে রাখা হয়। এখানে গরম বাতাসের সংস্পর্শে ইটগুলি শুকিয়ে যায়। ফলে পরবর্তী পর্যায়ে সেগুলিকে ভাল করে পোড়ানো যায়।
  3. সদ্য তৈরি হওয়া ইটকে ঠাণ্ডা করার অঞ্চল বা কুলিং জোন যেখানে ইট তৈরি হয়ে গেলে দেওয়ালের জানালা খুলে বাইরের ঠাণ্ডা বাতাস ঢোকানো হয়। পোড়া ইটের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ওই ঠাণ্ডা বাতাস ইট থেকে তাপ শুষে নিয়ে নিজে গরম হয়ে যায় আর ইটকে ঠাণ্ডা করে। আর গরম বাতাস পরের চেম্বারের কাঁচা ইটকে শুকনো করে চলে যায় চিমনির দিকে।

কোন ধরনের জ্বালানি ব্যবহার হয়?

কয়লা, কাঠকয়লা, গাছের শুকনো ডাল কিংবা খড় এই প্রযুক্তিতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

ভাটার প্রতিটি চেম্বারে জ্বালানি ঢোকানোর জন্য দুটি পথ থাকে। প্রতিটি চেম্বারে জ্বালানি ঢুকিয়ে তাতে আগুন দেওয়ার জন্য ফায়ারম্যান থাকে। এক একটি ভাটায় দুটি শিফটে দুজন করে ফায়ারম্যান থাকেন।

ভাটার ভিতরে বাতাস এবং আগুন কোন পথ ধরে এগোয়?

চিমনি গরম হাওয়া টেনে নেওয়ার ফলে ভাটার ভিতরে নিম্নচাপের এলাকা তৈরি হয়। আর তার জেরে জানালা দিয়ে বাইরের ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকে পড়ে ভাটার ভিতরে। তা নিম্নচাপ এলাকা ধরে ভাটার ভিতরে আঁকাবাঁকা পথে এগোয়। আর বিভিন্ন চেম্বারে যখন আগুন ধরানো হয়, তখন তা ওই বাতাসের পথই অনুসরণ করে।

বাইরের ঠাণ্ডা বাতাসকে প্রথমে সদ্য পোড়ানো ইটের উপর দিয়ে বইতে দেওয়া হয়। তার ফলে ইট যেমন শুকনো হয়, তেমনই বাতাস কিছুটা গরম হয়। সেই বাতাস ঢোকে ফায়ারিং চেম্বারে ।সেখান থেকে তাকে পাঠানো হয় প্রি হিটিং এলাকায়, যেখানে কাঁচা ইট সাজানো থাকে। অতি গরম বাতাস সেই ইটকে কিছুটা শুকনো করে নির্দিষ্ট পথ ধরে চিমনির দিকে এগিয়ে যায়।

যে নালী পথে ভাটার ভিতরে বাতাস চলাচল করে তার দুটি অংশ। কেন্দ্রীয় মূল নালী ও শাখানালী। শাখানালীগুলি ভাটার বিভিন্ন চেম্বার থেকে এসে মূল নালীতে এসে খোলে। ইংরেজি “এল ” অক্ষরের আকারে শাখানালী গুলি মূল নালীর দেওয়ালে খোলে। অন্য দিকটা ভাটার খাঁড়ি বা সুরঙ্গে খোলে। শাখানালী যে বাতাস সংগ্রহ করে তা মূল নালী তে জমা হয় এবং চিমনি দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়।

শাখানালীগুলি মূল নালীর সঙ্গে উল্টো ” ইউ ” আকৃতির ধাতব নালী দিয়ে যুক্ত থাকে। এই অংশগুলিকে স্টান্ট বা দরজা বলে। সাধারণত ভাটা চলার সময়ে পর্যায়ক্রমে একটি বা দুটি দরজা খুলে রাখা। বাকি দরজা কংক্রিটের স্ল্যাব দিয়ে ঢাকা থাকে।

যেখান দিয়ে পোড়া ইট বাইরে বের করে আনা হয় সেই জানালা দিয়ে বাইরের বাতাস ভাটার মধ্য ঢোকে। সেই বাতাস সদ্য পোড়া ইটের স্তরের মধ্য দিয়ে পাঠানো হয় ফায়ারিং এলাকায়। সেখান থেকে অতি গরম বাতাস যায় প্রি হিটিং এলাকায়। যেখানে কাঁচা ইট সাজানো থাকে। ওই গরম বাতাস কাঁচা ইটকে কিছুটা শুকিয়ে শাখানালী দিয়ে চলে যায় মূল নালীতে। সেখান থেকে চিমনি হয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়।

ভাটার সব ক’টি প্রকোষ্ঠ কিন্তু এক সময়ে ইট পোড়ানোর কাজে লাগানো হয় না। একটি প্রকোষ্ঠে ইট তৈরি হয়ে গেলে সেখানে জ্বালানির কোনও দরকার পড়ে না। তখন পাশের প্রকোষ্ঠের জানালা খুলে দেওয়া হয়। এই ভাবেই পর্যায়ক্রমে একটার পর একটা প্রকোষ্ঠে ইট তৈরি চলতে থাকে।

15 থেকে 20 ফুট অর্থাৎ 3 তে চেম্বার এ ইট পোড়ানো হয় প্রতিদিন (24 ঘন্টায়) যাতে 20,000 থেকে 50,000 ইটের উৎপাদন হয়।

ইটের ভরাই ও নিকাশী কি করে হয়

একটি ইট ভাটার থেকে প্রতিদিন ইটের নিকাশি হয়. কুলিং জোন থেকে ইটের নিকাশি হয়। যখন ইট সম্পূর্ণ ঠান্ডা হয় যায় তখন এক এক করে ইটের নিকাশি হয় এবং যেকটা ইট নিকাশি হয় সেকটা শুকনো ইট আবার ভাতার প্রী হিটিং জানে ভরাই করা হয়।

ভাতার ধার দিয়ে প্রতিনিয়ত অবস্থিত উইকেট গেট দ্বারা কর্মীরা ভাতার ভেতরে বাইরে করতে পারে ইট নিয়ে।

আরও জ্ঞান সারমর্ম জন্য এখানে ক্লিক করুন এখানে ক্লিক করুন বেশী উচ্চতার চিমনিযুক্ত আঁকাবাঁকা পথের ইটভাটা (Natural Draught Zigzag Kiln, NDZK) মেইন পেজে যাওয়ার জন্যClick here to go to User Home